
মাহ্ফুজ নবীন:
বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের জনগণের ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ বলে সম্বোধন করার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। বরং সংবিধান অনুসারে সরকারি চাকরিজীবীরা জনগণের সেবক। এই বিষয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের মধ্যে সরকারি নিয়ম-কানুন ও প্রশাসনিক বক্তব্য স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এটি কোনো বাধ্যতামূলক প্রথা নয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: “প্রজাতন্ত্রের সেবায় নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির সর্বদা জনগণের সেবা করার চেষ্টা করা কর্তব্য।” এই অনুচ্ছেদটি সরকারি কর্মকর্তাদের জনগণের সেবক হিসেবে চিহ্নিত করে, যেখানে জনগণকে তাদের উপরে রাখা হয়েছে। সংবিধানের এই মূলনীতি অনুসারে জনগণ প্রজাতন্ত্রের মালিক এবং কর্মকর্তারা তাদের সেবায় নিয়োজিত।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সরকারি নিয়ম অনুসারে, “রুলস অব বিজনেস” বা অন্য কোনো সরকারি বিধিমালায় জনগণকে সরকারি কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ বলতে হবে—এমন কোনো নির্দেশনা নেই। ২০২১ সালে তৎকালীন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন স্পষ্ট করে বলেছিলেন, “রুলস অব বিজনেসে সরকারি কর্মকর্তাদের স্যার বা ম্যাডাম বলার কোনো নির্দেশ নেই। এটি জনগণের সেবক হওয়ার বঙ্গবন্ধুর নির্দেশের পরিপন্থী।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কর্মকর্তাদের আচরণই সরকারের আচরণ।
সরকারি আচরণবিধি (বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা, ১৯৭৯) এবং অফিসিয়াল চিঠিপত্রে সম্বোধনের ক্ষেত্রে সাধারণত “জনাব”, “মহোদয়/মহোদয়া” বা পদবি ব্যবহারের রীতি প্রচলিত। ‘স্যার-ম্যাডাম’ মূলত ঔপনিবেশিক আমলের অবশেষ এবং সামাজিক প্রথা হিসেবে চললেও এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই। ১৯৯০ সালে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনেও সরকারি অফিসে ‘স্যার’-এর পরিবর্তে ‘জনাব’ ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার নারী কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ সম্বোধনের হাসিনা আমলের নির্দেশিকা বাতিল করেছে, যা এই প্রথার বিরুদ্ধে আরও স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সরকারি কর্মকর্তাদের জনগণের সঙ্গে বিনয়ী ও সেবামূলক আচরণ করতে হবে। জনগণের কোনো আইনি দায়িত্ব নেই কর্মকর্তাদের বিশেষ সম্মানসূচক ডাক দিয়ে সম্বোধন করার। বরং সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদেরই দায়িত্বশীল হতে হবে।
এই বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে আরও সুস্পষ্ট নির্দেশিকা জারির দাবি উঠেছে। সরকারি সেবা নিতে এসে জনগণ যাতে হয়রানি বা অসম্মানের শিকার না হয়, সেদিকে নজর দেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
এই প্রথা পরিবর্তনে সংবিধানের মূল চেতনা ও জনগণের সার্বভৌমত্বকে সমুন্নত রাখা সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে।
মন্তব্য করুন