
ঢাকা প্রতিনিধি:
আনোয়ার হোসেন। পরিচয় দিয়ে থাকে মিরপুরের একেবারে স্থানীয়। বহুরূপী মুখোশে আড়ালে সে তার মাথার চুলটাকে যেভাবে নানান ডংগে পেচিয়ে টাক মাথাটাকে আড়াল করে; তেমনি সহজ- সরল মানুষদের কথার জালে পেচিয়ে, ছলে- বলে কৌশলে বের করে ফেলেন, টাকা।
সেসব টাকা অন লাইন বিজনেস এর কথা বলে, অথবা প্রায়শয়ই সে বলে- বিভিন্ন ভালো কোম্পানি খবর পেলে নিজেও ইনভেস্ট করে আর যদি কেউ তার কাছে কাছে আসে, তাকেও তিনি ইনভেস্ট করতে বলেন।
এটাই তার সহজ সরল উক্তির মাঝে টোপ ফেলার প্রাথমিক ফাঁদ। কখনো সে মানুষের মগজ ধোলায়ের মতো, কারো কারো ব্রেনকেও হ্যাক করে ফেলে। আনোয়ারের লক্ষ হচ্ছে সরকারি অবসরপ্রাপ্ত লোকজন। তারা একে তো কর্মহীন কেউ কেউ কিছু একটা করতে চাচ্ছে। এই সুযোগটাই কাজে লাগিয়ে সুকৌশলে বের করে আনে তাদের পেনশনের টাকা।
তাই বলেই ইসিবি চত্বরের পাশে তার ওয়াসি টাওয়ারের ৫ম তলায় প্রয়োজন গ্লোবাল লিমিটেড নামে একটা নিত্য প্রয়োজনীয় হলুদ, মরিচ, রোসনসহ, নানান পন্যে একটা সাজানো ডেক্স এবং বাহারি গাছের অক্সিজেন সম্মৃদ্ধ পরিবেশ চলছে একটু ডাক ডোল পিটিয়েই যেন প্রতারণার বিস্তৃত প্রকল্প।
প্রতারক আনোয়ার বলে থাকে- “আপনি ৪০ দিনে যা ইনভেস্ট করবেন তার দায়িত্ব আমার”, এখানেই শেষ নয় এসব টাকা হাতিয়ে নেয়ার জন্য তিনি অনেক লোকের সঙ্গে স্টাম্পে চুক্তি করেও টাকা নিয়ে থাকেন। অথচ এসব টাকা বাংলাদেশ থেকে ডলার হিসেবে যেমন পাচার করছে তেমনি ক্রিপ্টো কারেন্সি বিজনেস করার তার লাইসেন্সও নেই।
জানা যায়, ১০০ কোটি টাকা বা তারও বেশি টাকা এই জাম্বো টিকেট নামক কোম্পানিতে তিনি প্রলোভন দেখিয়ে পাঠিয়েছে।
তার প্রলোভনগুলো এমন- আপনি যদি ১০০০$ ডলার ইনভেস্ট করেন প্রতিদিন বাংলাদেশী ১৭০০ টাকা পাবেন, ট্যাক্স ভ্যাট কেটে ১৫০০/- টাকা পাবেন। এভাবে প্রতিদিন পাবেন তবে মাসে পাবেন ২২ দিন। কারণ- শনিবার ও রোববার পেমেন্ট বন্ধ থাকে। আর যাই পান আমি আনোয়ার হোসেন বলছি- আপনার টাকা ৪০ দিনে আমি ফেরত দিয়ে দেবো, নিশ্চিত থাকেন।
এভাবে আপনি যদি নিজে ১০০০$ ডলার ইনভেস্ট করেন তার গ্যারান্টি ছাড়া তবে সব দায় দায়িত্ব আপনার নিজেরই। আর যদি আনোয়ারের সঙ্গে চুক্তি ভিত্তিক ইনভেস্ট করেন তবে আনোয়ার দেবে এভিডেভিড, স্টাম্পে চুক্তিপত্র এবং মূল টাকার চেক। চেকটি দেবেন আনোয়ার নিজে।
এই যাবতীয় চুক্তি সংক্রান্ত কার্যক্রম করে আনোয়ারের লাভ কী? লাভ একটাই আনোয়ারের ভাষ্য মতে- জাম্বো টিকিট কোম্পানি ৪০০ দিন যে টাকা তারা দিবে তা ৪০ দিনে আপনি আপনার ইনভেস্ট এর টাকা আনোয়ারের কাছ থেকে বুঝে নিবেন। আর বাকি ৩৬০ দিনের টাকার অর্ধেক আনোয়ার আর আপনি পাবেন অর্ধেক। তাতে ১০০০$ ডলার ইনভেস্ট করে ৪০০ দিনে বাংলা টাকায় ৬ লক্ষ টাকা এবং ৩৯৯ দিনের পর আপনার মূলধন ১০০০$ ডলারও জাম্বো টিকেট কোম্পানি ফেরত দিবে। তাহলে মোট পাবেন ১০০০$ ইনভেস্ট করে ৪০০ দিনে বাংলা টাকায় ৭০০০০০/- সাত লক্ষ টাকা। যা বিশাল লোভনীয় অফার করে থাকে প্রতারক আনোয়ার।
এমন অফার আরো আছে যারা ১০০০$ ডলার ইনভেস্ট করবে তারা ১.৫ $ পার্সেন্ট প্রতিদিন কিন্তু ৫০০০$ ডলার ইনভেস্ট করবে তার ২.০$ পার্সেন্ট হারে প্রতিদিন। তাতে আনোয়ারের কথা অনুযায়ী কেউ ৬ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা বা ৫০০০$ ডলার ইনভেস্ট করলে ৪০০ দিনে সে প্রায় ৫০,০০ ০০০ ( পঞ্চাশ লক্ষ) টাকার মালিক হয়ে যাবেন।
আপনি তো লম্বা স্বপ্নে এবার কোটিপতি হবেন ভাবছেন কিন্তু স্বপ্নটি ভুল। কোম্পানিও কদিন পরে টাকা দিবে না বা নানা ডেভেলপমেন্ট চলছে বা পলিসি মেকিং এর কারণে পেমেন্ট বন্ধ রাখবে, আর আপনি এদিকে সর্বশান্ত হয়ে আনোয়ারের আশায় তার প্রয়োজন লিমিটেড এর আড়ালে জাম্বো টিকেট এর অফিসে ঘুরতে থাকবেন এই ওয়াসি টাওয়ারে।
শুনেছি ওয়াসি টাওয়ারেই নাকি কোথাও টর্চার সেলে তৌহিদ আফ্রিদী কাকে যেন নিয়ে আটকে রেখে নির্যাতন করতো! আসলে সমস্যা কি টাওয়ারে নাকি প্রতারক কোম্পানিগুলো কে কী করছে তা টাওয়ারের মালিকগণ খোঁজ না রাখার কারণে? নাকি রাষ্ট্রের ও অনলাইন বা যাবতীয় বিজনেস করার আপডেট খোঁজ না রাখার কারণে বাড়ছে এমন হায় হায় কোম্পানির টাকা হাতিয়ে নেয়া প্রকল্প?
এবার যেভাবে গল্পটা শেষ হয়। কয়েক দিন আনোয়ার পেমেন্টও দেয় কিন্তু কিছুদিন পরেই শুরু হয় ভিন্ন চিত্র। এখন কোম্পানি কয়েন ছেড়েছে। কয়েন এক্সচেঞ্জে লিস্টে আসলেই ক্যাশ করতে পারবেন। ইত্যাদি ইত্যাদি।
আনোয়ার তার তুখোড় চালাকির জালে এমন সব মানুষদের ফেলেছে তারা কেউ কেউ আছে লোকলজ্জার বা সামাজিক অবস্থানের কারণেও কোথায় অভিযোগ করতে পারছেন না।
এদের মধ্যে কেউ কেউ রিটায়ার্ড মেজর, কর্নেল, ও অনেক আর্মি অফিসার। কেউ কেউ থানায় অভিযোগ করেছে শুনেছি। কিন্তু সাধারণ যারা প্রতারক আনোয়ারের প্রতারণা বুঝে ওঠার আগেই ফাঁদে পা দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি চলে যায়।
এমন একজনার প্রতারিত হবার গল্প শুনলাম। যাকে ঠান্ডা মাথায় ফাঁদে ফেলা হয়েছে। আনোয়ারের নিয়োজিত দালাল চক্রের কমিশন ভিত্তিক ফাঁদে প্রয়োজন অফিসে প্রতিদিন দুপুরে কখনো রাতেও খাবারের আয়োজন করে থাকে। তারা খায় লোকজন নিয়ে আসে, কেউ বলে ভালো টাকা পেয়েছি। আপনিও আসেন। এভাবে একটা বিবিএল সিস্টেমে এমএলএম বা ক্রিপ্টো কারিন্সিতে ইনভেস্ট করাবে নানা প্রলোভনে। আপনি নিজেও বুঝবেন যা করতে যাচ্ছেন তা আইনগত ভাবে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ। কিন্তু আপনি জানছেন, আপনি আনোয়ারের সঙ্গে বিজনেস করছেন। এক পর্যায়ে টাকা দিলেন তো আর অমনি ফেঁসে গেলেন।
এমন প্রতারক আনোয়ার ঢাকার অলিগলিতে প্রতিদিন জন্ম হয়। যাদের টার্গেট এতটাই সুক্ষ্ম আপনি নিজেই এক সময় প্রতারিত হবে উৎসাহ নিয়ে এমন ভাবনায়ই আনোয়ারের হাতে টাকা তুলে দিবেন। আর কোন কোন আনোয়ারের হয় নিউজ, মামলা, সাক্ষাৎকার কিছু আলোচনা সমালোচনা ইত্যাদি ইত্যাদি।
কিন্তু এমন প্রতারক আনোয়ারদের রুখে দেয়ার আসল পথটা তবে কোথায়? তবে রাষ্ট্রের কি এখন দায়িত্ব নেবার সময় এসেছে? যদি রাষ্ট্র “চিটার বিজনেস পলিসি ওনার ফাইন্ড আউট সেন” গঠন করা এখন অতী জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নয়তো প্রতারণার অফিস প্রতিদিন বাড়বে। আর সাধারণ জনতা হবে প্রতারণায় জিম্মি।
মন্তব্য করুন