
মাহ্ফুজ নবীন:
কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত থেকে প্রায় চারশ কিলোমিটার সড়কপথের নিরাপত্তা চেইন, বিভিন্ন জেলার চেকপোস্ট, গোয়েন্দা নজরদারি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সুনির্দিষ্ট তল্লাশি—সব কিছুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রাজধানী ঢাকায় পৌঁছাচ্ছে কোটি কোটি টাকার ইয়াবা ও অন্যান্য বিষাক্ত মাদকের চালান।
প্রশাসনের একের পর এক ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা ও শত শত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে খুচরা ও মধ্যম সারির পাচারকারীরা যেভাবে একের পর এক সফল চালান রাজধানী পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছে, তা নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন উঠছে। তাদের এই ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু ‘সফল’ নেটওয়ার্ক দেখে অপরাধ চক্রের ভেতর এটিকে দক্ষতা ভাবা হলেও, সচেতন নাগরিক ও সামাজিক বিশেষজ্ঞদের মতে এটি আসলে রাষ্ট্রের জন্য এক চরম উদ্বেগের বিষয়।
অপরাধীদের অভিনব পথ ও কৌশল
সীমান্ত এলাকা থেকে রাজধানী ঢাকায় মাদক পৌঁছাতে পাচারকারীরা যেসব ছক ব্যবহার করছে:
* পরিবহন ব্যবস্থার অপব্যবহার: সাধারণ যাত্রীবাহী বাস, সবজির ট্রাক, কুরিয়ার সার্ভিস, এমনকি অ্যাম্বুলেন্স কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্টিকারযুক্ত গাড়ি ব্যবহার করা হচ্ছে।
* শরীরে ও মালামালে লুকানো: চালের বস্তা, ফল বা ডাবের ভেতর, ইলেকট্রনিক্স পণ্যের ভেতরে কৌশলে ইয়াবা ও আইস প্যাক করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পেটের ভেতরে করে বহন করা হচ্ছে এসব প্রাণঘাতী বস্তু।
* প্রযুক্তির ব্যবহার: সরাসরি যোগাযোগ এড়াতে এনক্রিপ্টেড অ্যাপস এবং নিয়মিত সিম পরিবর্তন করে ট্র্যাকিং এড়িয়ে চলছে চক্রটি।
প্রশ্ন উঠছে তদারকি ও সদিচ্ছা নিয়ে
কয়েক স্তরের সীমান্ত পাহারা, র্যাব, পুলিশ, কোস্ট গার্ড, বিজিবি এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) মতো একাধিক সংস্থার সক্রিয় উপস্থিতির পর কীভাবে এসব কন্টিনজেন্ট ঢাকায় ঢুকে পড়ে?
কোনো কোনো অপরাধ বিশ্লেষক মনে করছেন, এটি কেবল মাদক ব্যবসায়ীদের ‘চাতুর্য’ বা ‘কৌশলী সাফল্য’ নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে প্রশাসনিক দুর্বলতা, চেকপোস্টে শিথিল নজরদারি এবং অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসাধু সদস্যদের পরোক্ষ যোগসাজশ। ছোট বা মাঝারি মাত্রার কোনো মাদক ব্যবসায়ী একা পুরো ব্যবস্থার চোখ ফাঁকি দেবে—এমন সম্ভাবনা বাস্তবে খুবই কম।
পুরস্কার নাকি কঠোর শাস্তি?
একটি সাধারণ অপরাধী চক্রের এই ধরনের দুঃসাহসিক ও ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপের মাধ্যমে সাফল্য পাওয়াটা সাধারণ দৃষ্টিতে এক ধরণের “চতুর কৌশল” মনে হতে পারে। তবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে একে কোনোভাবেই প্রশংসা করার সুযোগ নেই। এই চাতুর্য মূলত দেশের তরুণ সমাজকে ধংসের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খুচরা ব্যবসায়ীদের এই ‘সাফল্য’ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দুর্বলতা ফুটিয়ে তোলে। এই পরিস্থিতিতে পাচারকারীদের কৌশলের সমকক্ষ বা তার চেয়েও আধুনিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করলে কেবল চেকপোস্ট বসিয়ে মাদক পাচার রোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
মন্তব্য করুন