
মাহ্ফুজ নবীন:
পটুয়াখালী জেলার মাদারবুনিয়া দাখিল মাদ্রাসা যেন আজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে একটি পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ১৬ জন শিক্ষক ও ৪ জন স্টাফের এই প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ৮ জন শিক্ষকের তীব্র সংকট চলছে। যেখানে পাঠদান সচল রাখার কথা শিক্ষকদের, সেখানে ক্লাস নিচ্ছেন খোদ দপ্তরি! আর এই অনিয়মকে বৈধতা দিয়ে সুপার মাওলানা সহিদুল ইসলাম গর্বের সাথে বলছেন, “এটার অনুমতি আমিই দিয়েছি।”
দপ্তরি দিয়ে ক্লাস ও সুপারের স্বেচ্ছাচারিতা
নিয়মবহির্ভূতভাবে দপ্তরি দিয়ে ক্লাস করানোর বিষয়ে জানতে চাইলে দপ্তরি আরিফ জানান, “তা আমি জানি না, সুপার আমাকে যা বলেন আমি সেটাই করি।” এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, সুপার সহিদুল ইসলামই এই মাদ্রাসার যাবতীয় অনিয়ম ও দুর্নীতির মূল কারিগর।
২৪ বছরের বঞ্চনা ও জমি আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ:মাদ্রাসার প্রাক্তন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী আবুল কালাম বিশ্বাসের জীবনে নেমে এসেছে এক চরম ট্র্যাজেডি। ২৪ বছর বিনা বেতনে চাকরি করার পর তার পাওনা বকেয়া বেতন নিয়ে চলছে চরম প্রতারণা।
তার অভিযোগ অনুযায়ী:
* মাদ্রাসার নামে ১৫ শতাংশ জমি দান করার কথা বলে বা তাকে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সুপার সহিদুল কৌশলগতভাবে তার ১৭ শতাংশ জমি নিজের নামে লিখিয়ে নেন। অথচ বর্তমান বাজারমূল্যে এই ১৭ শতাংশ জমির দাম প্রায় ১৭ লক্ষ টাকা।
* ২৪ বছর বিনা বেতনে শ্রম দেওয়ার পর তার বকেয়া ৫,৯৪,০০০ টাকার মধ্যে প্রাপ্য ২,৩৮,০০০ টাকা আজও পরিশোধ করা হয়নি। উল্টো সুপার সহিদুল তাকে হুমকি দিয়ে বলেছেন, বকেয়া টাকা তুলতে হলে তাকে আরও ৫০,০০০ টাকা ঘুষ দিতে হবে! চাকরির মেয়াদ শেষ হলেও সুপারের দুর্নীতির বেড়াজালে পড়ে আজও সেই টাকা বকেয়াই রয়ে গেছে।
* মাদ্রাসার উন্নয়নের কথা বলে দপ্তরি আবুল হোসেনের ১৪ শতাংশ জমির মাটি কেটে নিয়ে গেলেও আজও তা ভরাট করে দেওয়া হয়নি এবং মাটির ন্যায্যমূল্যও পরিশোধ করা হয়নি।
* শুধু তাই নয়, দপ্তরি আবুল কালাম সিকদারের ছেলে জহিরুলের ৩ বছরের বৃত্তির টাকাও সুপার সহিদুল নিজে তুলে আত্মসাৎ করেছেন।
শিক্ষকদের পদে স্বজনপ্রীতি ও পারিবারিক সিন্ডিকেট
সাধারণ শিক্ষকরা যেখানে নিয়মিত বেতন পেতে সংগ্রাম করছেন, সেখানে সুপার এবং তার পরিবারের সদস্যরা নিয়মিত বেতন তুলে নিচ্ছেন। অথচ তাদের কাউকেই মাদ্রাসার জন্য এক টুকরো জমিও দান করতে হয়নি!
মাদ্রাসাটিকে পারিবারিক সিন্ডিকেটে রূপ দিতে সুপার সহিদুল ইসলাম নিজের স্ত্রী, দুই ভাইসহ, আরো দুই বোন জামাই ঘনিষ্ঠ স্বজনদের শিক্ষক পদে বসিয়েছেন।
প্রশ্ন উঠেছে— তাদের নিয়োগ কি যথাযথ ভাবে হয়েছিলো? নাকি স্বজনপ্রীতিই তাদের মূল যোগ্যতা? একটি পিয়ন বা দপ্তরি পদে চাকরি পেতে যেখানে লাখ লাখ টাকা লেনদেন করতে হয়, সেখানে সুপারের পরিবার থেকে মাদ্রাসায় কে কত শতাংশ জমি দিয়েছে?
অসহায় মানুষের আর্তনাদ:
যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার কথা ছিল আলো ছড়ানোর জন্য, আজ সেই মাদারবুনিয়া দাখিল মাদ্রাসাকে সুপার সহিদুল ইসলাম ও তার পরিবার বানিয়ে তুলেছে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির এক নরকরাজ্য। সহজ-সরল ও নিবেদিতপ্রাণ মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রতিবাদ করার সাহসটুকুও আজ তাদের কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপে এই দুর্নীতিবাজ সুপারের অনিয়মের তদন্ত এবং মাদ্রাসাকে পারিবারিক ব্যবসার কবল থেকে মুক্ত করার জোর দাবি জানাচ্ছি।
মন্তব্য করুন