
মাহ্ফুজ নবীন:
বাংলাদেশে বাণিজ্যিক যৌনতা (prostitution) একটি বহুমুখী ও জটিল সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা। এটি শুধু ঐতিহ্যবাহী পতিতাপল্লীতে সীমাবদ্ধ নয়। এর বিভিন্ন ছদ্মবেশ ও পরিচয় রয়েছে, যা সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে আছে। এই ব্যবস্থা শুধু নৈতিকতা বা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে—বিশেষ করে এইচআইভি/এইডসের মতো যৌনবাহিত রোগের (STI) বিস্তার। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. বাণিজ্যিক যৌনতার বিভিন্ন রূপ
বাংলাদেশে যৌনকর্মীরা প্রধানত কয়েকটি শ্রেণিতে বিভক্ত:
- সরাসরি পতিতাপল্লীভিত্তিক যৌনকর্মী: ঢাকার কামরাঙ্গীচর, ফরিদপুর, নারায়ণগঞ্জ, সিলেটসহ বিভিন্ন জায়গায় আইনত স্বীকৃত বা অস্বীকৃত পল্লী রয়েছে। এখানে সরাসরি লেনদেন হয়। এরা সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং সামাজিকভাবে সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত।
– হোটেল ও ছদ্মবেশী অপারেটর: অনেকে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ম্যাসাজ পার্লার বা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম (ফেসবুক, টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম) ব্যবহার করে ক্লায়েন্ট ধরেন। এরা প্রায়ই “কল গার্ল”, “ফ্রিল্যান্স মডেল” বা “এসকর্ট” নামে পরিচিত। ধরা পড়লে মামলা হয়, কিন্তু নেটওয়ার্ক শক্তিশালী।
– রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ছত্রছায়া: কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুরক্ষায় এই ব্যবসা চলে। এটি সবচেয়ে ক্ষতিকর, কারণ এরা আইনের উর্ধ্বে থাকার চেষ্টা করে।
- মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক প্রচারণা: গ্ল্যামারাইজড “মডেলিং”, “অভিনয়”, “ইনফ্লুয়েন্সার” কালচারের আড়ালে যৌন সেবা প্রচারিত হয়। কিছু ওয়েব সিরিজ, নাটক বা সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্টে অতিরিক্ত যৌনায়ন (sexualization) এই ধারণাকে স্বাভাবিক করে তোলে।
– উচ্চবিত্ত ও প্রভাবশালীদের সাথে যুক্ত নেটওয়ার্ক: ধনী ব্যবসায়ী, রাজনীতিক বা সেলিব্রিটিদের সাথে “পার্টি”, “প্রাইভেট ট্যুর” বা “সেকেন্ডারি রিলেশনশিপ”-এর নামে এই কাজ চলে। এরা প্রায়ই সাইনবোর্ড বা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে থাকে।
এই বিভিন্নতার কারণে একক “পতিতা” শব্দ দিয়ে পুরো চিত্র ধরা যায় না। অর্থনৈতিক দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব, পারিবারিক নির্যাতন, মাদকাসক্তি এবং ট্রাফিকিং এর মূল চালিকাশক্তি।
২. এইচআইভি/এইডসের ঝুঁকি
বাংলাদেশে এখনও এইচআইভি প্রিভ্যালেন্স কম (জাতীয় হার প্রায় ০.১% এর নিচে), কিন্তু “কী পপুলেশন” (key populations)-এর মধ্যে ঝুঁকি অনেক বেশি। যৌনকর্মীদের মধ্যে সেফ সেক্স প্র্যাকটিস (কনডম ব্যবহার) কম হলে রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা বাড়ে।
- পল্লীভিত্তিক কর্মীদের মধ্যে কনডম ব্যবহারের হার কিছুটা বেশি (এনজিও প্রোগ্রামের কারণে)।
- ছদ্মবেশী গ্রুপে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, কারণ তারা প্রায়ই ক্লায়েন্টের সাথে “ট্রাস্ট” তৈরি করে কনডম এড়িয়ে যায়।
- মাদকাসক্তি ও অ্যালকোহলের সাথে যুক্ত হলে ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পায়।
সরকারি তথ্য ও এনজিও (যেমন ব্র্যাক, আইসিডিডিআর,বি) অনুসারে, নিয়মিত টেস্টিং ও ট্রিটমেন্ট (ART) না হলে এটি জেনারেল পপুলেশনে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
৩. “চিহ্নিতকরণ” vs বাস্তবসম্মত সমাধান
শুধু “চিহ্নিত করে” সমস্যার সমাধান হয় না। ইতিহাস দেখায়, নিষিদ্ধকরণ (prohibition) বা শুধু পুলিশি অভিযান সমস্যাকে আরও অদৃশ্য ও বিপজ্জনক করে।
প্রস্তাবিত বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ (এইডস-মুক্ত বাংলাদেশের লক্ষ্যে):
1. পাবলিক হেলথ অ্যাপ্রোচ:
– যৌনকর্মীদের জন্য ফ্রি, গোপনীয় এইচআইভি টেস্টিং, কনডম বিতরণ ও PrEP (প্রিভেনটিভ ওষুধ) প্রোগ্রাম বাড়ানো।
– মোবাইল ক্লিনিক ও পিয়ার এডুকেটরদের মাধ্যমে আউটরিচ।
2. আইনি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা:
– বাণিজ্যিক যৌনতাকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে “নিয়ন্ত্রিত” করা (যেমন নেদারল্যান্ডস বা জার্মানির মডেল)। নিরাপদ জোন, লাইসেন্সিং, বয়স নিশ্চিতকরণ।
– ট্রাফিকিং ও জোরপূর্বক যৌনতার বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ।
3. সামাজিক-অর্থনৈতিক পুনর্বাসন:
– দরিদ্র নারীদের জন্য দক্ষতা প্রশিক্ষণ, শিক্ষা ও বিকল্প কর্মসংস্থান।
– মাদক নিয়ন্ত্রণ ও পারিবারিক সহায়তা প্রোগ্রাম।
4. সচেতনতা ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন:
– স্কুল-কলেজে যৌনশিক্ষা (sex education) চালু।
– মিডিয়ায় দায়িত্বশীল কনটেন্ট প্রচার। পর্নোগ্রাফি ও অতিরিক্ত যৌনায়নের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে আলোচনা।
– পুরুষদের দায়িত্বশীল আচরণের প্রচার (কনডম ব্যবহার, একাধিক পার্টনার এড়ানো)।
5. ডেটা-ভিত্তিক চিহ্নিতকরণ:
– সরকারি-বেসরকারি সংস্থা মিলে ম্যাপিং করা (কোন এলাকায় কোন ধরনের নেটওয়ার্ক বেশি)। কিন্তু ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করে। ভিজিলান্টিজম (বেসরকারি শাস্তি) এড়ানো উচিত, কারণ তা আরও বেশি নির্যাতন ডেকে আনে।
যৌনকর্মীদের “চিহ্নিত” করার চেয়ে বড় কাজ হলো কারণগুলো দূর করা। দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও অসমতা না কমালে এই ব্যবসা চলতেই থাকবে। একই সাথে পুরুষদের চাহিদা কমাতে সামাজিক-নৈতিক শিক্ষা জরুরি। এইডস-মুক্ত বাংলাদেশ সম্ভব যদি আমরা নৈতিকতা ও বাস্তবতার মাঝামাঝি একটি মানবিক পথ বেছে নিই—যেখানে যৌনকর্মীদেরও মানুষ হিসেবে দেখা হবে, তাদের সুরক্ষা দেওয়া হবে এবং সমাজের সব স্তরে দায়িত্বশীল আচরণ প্রচার করা হবে।
সরকার, এনজিও, মিডিয়া ও নাগরিক সমাজকে একসাথে কাজ করতে হবে। শুধু নিন্দা নয়, সমাধান চাই।
তথ্যসূত্রের জন্য: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এইচআইভি প্রোগ্রাম, UNAIDS রিপোর্ট এবং স্থানীয় এনজিওদের তথ্য অনুসরণ করুন। যদি আরও নির্দিষ্ট তথ্য বা প্রোগ্রামের বিস্তারিত চান, জানান।
মন্তব্য করুন