
মাহ্ফুজ নবীন:
‘বাংলাদেশ’ নামটি কেবল একটি ভৌগোলিক পরিচয় নয়, এটি হাজার বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি, সংগ্রাম ও জাতীয়তাবাদের প্রতীক। প্রাচীন বঙ্গদেশ থেকে শুরু করে মুঘল, নবাবী, ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল হয়ে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ — এ অঞ্চলের নাম বারবার বদলেছে প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কারণে।
প্রাচীন আমল: “বঙ্গদেশ বা বঙ্গ”
প্রাচীনকালে এই অঞ্চল “বঙ্গদেশ বা বঙ্গ” নামে পরিচিত ছিল। মহাভারত, ঐতরেয় আরণ্যকসহ প্রাচীন গ্রন্থে বঙ্গ জনপদের উল্লেখ পাওয়া যায়। বঙ্গ শব্দটি সম্ভবত প্রাচীন জনগোষ্ঠী বা জলাভূমির সঙ্গে যুক্ত। পরবর্তীকালে ‘বাঙ্গাল’ বা ‘বাংলা’ নামের উৎপত্তি হয় এখান থেকেই।
মুঘল আমল: “সুবাহ বাংলা” বা “সুবাহ-ই-বাঙ্গালা”
১৫৭৬ সালে আকবরের আমলে দাউদ খান কররানির পরাজয়ের পর এ অঞ্চল মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান প্রদেশ হয়। প্রশাসনিক নাম ছিল “সুবাহ বাংলা”। এতে বর্তমান বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ওড়িশাসহ বিস্তীর্ণ এলাকা অন্তর্ভুক্ত ছিল। রাজধানী ছিল তান্ডা, রাজমহল, ঢাকা (জাহাঙ্গীরনগর) ও মুর্শিদাবাদ। এ সময় বাংলা ছিল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে সমৃদ্ধ প্রদেশ।
নবাবী আমল: “বাংলা সুবাহ” বা “সুবাহ বাংলা” (স্বাধীনতার দিকে)
মুঘল দুর্বলতার সুযোগে ১৭১৭ সাল থেকে মুর্শিদকুলি খানের নেতৃত্বে নবাবী শাসন শুরু হয়। এ সময়ও আনুষ্ঠানিকভাবে “সুবাহ বাংলা” নামই বজায় ছিল, কিন্তু নবাবরা প্রায় স্বাধীনভাবে শাসন করতেন। মুর্শিদাবাদকে রাজধানী করে বাংলা, বিহার ও ওড়িশা নিয়ে শক্তিশালী প্রশাসন গড়ে ওঠে। শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সময়ও এ অঞ্চল “বঙ্গ” নামে উল্লেখিত হতো।
ব্রিটিশ আমল: “বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি”
পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭) এর পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন শুরু হয়। এ অঞ্চলের নাম হয় “বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি”। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গে পূর্বাংশ “পূর্ব বাংলা” নামে পরিচিত হয়। বঙ্গভঙ্গ রদ হলেও নামের ধারণা থেকে যায়।
পাকিস্তান আমল: “পূর্ব পাকিস্তান”
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর এ অঞ্চল পাকিস্তানের অংশ হয়। প্রথমে “পূর্ব বাংলা”, পরে ১৯৫৫-৫৬ সালে “পূর্ব পাকিস্তান” নামকরণ হয়। এ নাম পরিবর্তনের বিরোধিতা করে বাঙালি জাতীয়তাবাদ জোরদার হয়।
স্বাধীন বাংলাদেশ
১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর শেখ মুজিবুর রহমান “বাংলাদেশ” নাম ঘোষণা করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভের পর এ নাম স্থায়ী হয়। ১৯৭২ সালের সংবিধানে “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ” নাম নির্ধারিত হয়।
এই নাম পরিবর্তনের ইতিহাস শুধু প্রশাসনিক নয় — এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার সংগ্রামের কাহিনি। আজও ৫ ডিসেম্বরকে “বাংলাদেশ দিবস” হিসেবে স্মরণ করা হয়।
“সূত্র:” উইকিপিডিয়া (সুবাহ বাংলা, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি), ঐতিহাসিক গ্রন্থ (আইন-ই-আকবরী), বিবিসি বাংলা, একুশে টিভি ও অন্যান্য নির্ভরযোগ্য দলিল।
এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় — নাম বদলায়, কিন্তু বাঙালির আত্মা অটুট।
মন্তব্য করুন