
মাহ্ফুজ নবীন:
ফুটবল ইতিহাসে কাকতালীয়ের চেয়েও বড় কোনো সংযোগ হয়তো আর নেই। ১৯৮৬ সালের ২২ জুন, মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দিয়েগো আর্মান্ডো ম্যারাডোনা ‘হ্যান্ড অফ গড’ এবং ‘গোল অফ দ্য সেঞ্চুরি’ করে আর্জেন্টিনাকে জয় এনে দিয়েছিলেন। ঠিক ৩০ বছর পর, একই দিনে (সময়ের তারতম্যে ২১-২২ জুন) লিওনেল মেসি কোপা আমেরিকা সেন্টেনারিওর সেমিফাইনালে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে নিজের জাদু দেখালেন। আর্জেন্টিনা ৪-০ গোলে জিতে ফাইনালে উঠল।
ম্যাচের বিস্তারিত ঘটনাক্রম:
৩য় মিনিটে প্রথম আঘাত: কর্নার কিক থেকে বল আংশিক ক্লিয়ার হলে মেসি বল পেয়ে যান বক্সের বাইরে। তিনি অসাধারণ এক চিপ পাস বাড়ান ডানদিকে, যেখানে এজেকুয়েল লাভেজ্জি দারুণ হেড করে বল জালে জড়িয়ে দেন। গোলকিপার ব্র্যাড গুজানের সামনে আর কিছু করার ছিল না। আর্জেন্টিনা ১-০ এগিয়ে যায়। এই অ্যাসিস্ট দিয়েই মেসি ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন।
৩২তম মিনিটে মেসির রেকর্ড-ভাঙা গোল: মাঝমাঠে ক্রিস ওয়ান্ডোলোভস্কির ফাউলের শিকার হন মেসি। প্রায় ২৫-২৭ গজ দূর থেকে ফ্রি-কিক। আর্জেন্টিনার দেয়াল সাজানো হয়, কিন্তু মেসির বাঁ-পায়ের অসাধারণ কার্লিং শট গুজানের বাঁ-হাতের উপর দিয়ে উপরের কোণে জড়িয়ে যায়। এটি ছিল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের
৫৫তম গোল — যা গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার ৫৪ গোলের রেকর্ড ভেঙে তাঁকে আর্জেন্টিনার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা বানিয়ে দেয়।
দ্বিতীয়ার্ধে আধিপত্য:
৫০তম মিনিটে গনজালো হিগুয়াইনের গোল — মেসির অবদানে। হিগুয়াইনের শট রিবাউন্ড হয়ে ফিরলে তিনি সহজেই গোল করেন।
৮৬তম মিনিটে হিগুয়াইনের দ্বিতীয় গোল — মেসির পিনপয়েন্ট পাস থেকে। মেসি বল পেয়ে হিগুয়াইনকে সামনে বাড়িয়ে দেন, যিনি সহজ ট্যাপ-ইন করেন।
মোট চার গোলের মধ্যে মেসি সরাসরি জড়িত ছিলেন সবগুলোতেই — একটি গোল, একটি অ্যাসিস্টের চেয়েও বেশি প্রভাব। এটি ছিল তাঁর টুর্নামেন্টের পঞ্চম গোল।
ম্যারাডোনা-মেসি সংযোগ:
১৯৮৬ সালের সেই ঐতিহাসিক দিনে ম্যারাডোনা একাই ইংল্যান্ডকে ধ্বংস করেছিলেন। ৩০ বছর পর মেসি সেই তারিখে নিজের উত্তরাধিকারকে আরও উজ্জ্বল করলেন। মেসি পরে বলেছিলেন, “এটাই আমাদের লক্ষ্য ছিল — আরেকটি ফাইনাল খেলা। আমরা এটা অর্জন করেছি। আমরা প্রথম দিন থেকেই দারুণ খেলছি।”
এই জয়ের পর আর্জেন্টিনা ফাইনালে চিলির মুখোমুখি হয় (যেখানে তারা পেনাল্টিতে হেরে যায়)। কিন্তু সেই রাতে হিউস্টনের এনআরজি স্টেডিয়ামে (৭০,৮৫৮ দর্শক) মেসি যা দেখিয়েছিলেন, তা ফুটবলপ্রেমীদের মনে চিরকাল থাকবে।
ফুটবলের দুই কিংবদন্তি, একই তারিখে জয়ের গান। ম্যারাডোনা যেমন আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিলেন, মেসিও পরবর্তীতে সেই স্বপ্ন পূরণ করেছেন। এই ধারাবাহিকতাই আর্জেন্টিনার ফুটবল ঐতিহ্যের সৌন্দর্য।
এক অবিস্মরণীয় সন্ধ্যা — যেখানে ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করলো।
মন্তব্য করুন