
বিশেষ প্রতিনিধি, পটুয়াখালী:
পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলার ঐতিহ্য ও শিক্ষার সাইনবোর্ড সর্বস্ব এক করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে ‘বাঁশবাড়িয়া কারিগরি ভোকেশনাল উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়’-এ। দীর্ঘ দুই দশক ধরে প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্তির অনিশ্চিত স্বপ্নে ঝুললেও থামেনি শিক্ষক নিয়োগের নামে লাখ লাখ টাকার জালিয়াতি বাণিজ্য। একদিকে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও শিক্ষার গুণগত মান তলানিতে, অন্যদিকে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক মইনুদ্দীন।
সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে উন্মোচিত অনিয়ম:
সম্প্রতি পটুয়াখালী জেলা শিক্ষা অফিসার মজিবুর রহমানের নজরে বিষয়টি আনেন স্থানীয় একদল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। জেলা শিক্ষা অফিসারের কার্যালয়ে সাংবাদিকরা অভিযোগের বিবরণ দিলে বিষয়টি নিয়ে জট খুলতে শুরু করে। পরক্ষণেই জেলা শিক্ষা অফিসার মইনুদ্দীনকে ফোন করে নিজের ছবি বিনা অনুমতিতে ফেসবুকে ব্যবহারের কারণ জানতে চান এবং অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
কথোপকথনের এক পর্যায়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ তোলেন প্রধান শিক্ষক মইনুদ্দীন। কিন্তু জেলা শিক্ষা অফিসার প্রমাণ চাইলে তিনি সাফ জানান, “আমার কাছে কোনো রেকর্ড বা প্রমাণ নেই।” এর মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকের ভিত্তিহীন ও মিথ্যা অভিযোগের মূল হাতিয়ার উন্মোচিত হয়ে যায়।
’প্রতিবন্ধী বাঁশের ডগায় পতাকা’ আর অদৃশ্য সাইনবোর্ডের বিদ্যালয়: বাস্তব চিত্র অনুসন্ধানে গিয়ে দেখা যায়, বাঁশবাড়িয়া কারিগরি ভোকেশনাল বিদ্যালয়ের নিজস্ব কোনো দৃশ্যমান সাইনবোর্ডও নেই। জাতীয় পতাকা উত্তোলনের জন্য যা ব্যবহৃত হচ্ছে, তা কেবল একটি বাঁকা বাঁশের খুঁটি—যা যেন পুরো প্রতিষ্ঠানের হেলে পড়া ও পঙ্গু প্রশাসনিক ব্যবস্থারই প্রতীকী রূপ।
পাসের হার এতটাই করুণ যে, প্রধান শিক্ষক মইনুদ্দীন নিজেই হাসিমুখে স্বীকার করেছেন, বর্তমান ফলাফলে এই প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে এই হাসির আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার রহস্য।
নিয়োগ বাণিজ্য ও স্বপ্নের ফাঁদ:
অভিযোগ রয়েছে, এমপিওভুক্তির মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে অসহায় ও চাকরিপ্রত্যাশী বহু শিক্ষকের কাছ থেকে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছেন মইনুদ্দীন। এমপিও হোক বা না হোক—শিক্ষকদের ঝুলিয়ে রেখে বছরের পর বছর নিজের পকেট ভারী করাই যেন তার আসল লক্ষ্য।
শিক্ষকরা বেতন পান না, প্রাইভেট পড়ানোর সুযোগও কম, অথচ তারা বছরের পর বছর স্কুলে আসছেন—এ যেন এক অলৌকিক অবাস্তবতা! বাস্তবতা হলো, শিক্ষকতার দোহাই দিয়ে প্রতিষ্ঠান খোলা রেখে এটি গড়ে তোলা হয়েছে এক রমরমা পারিবারিক অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে। বিদ্যালয়টির কোনো উন্নতি না হলেও, প্রধান শিক্ষক মইনুদ্দীন ঠিকই জমি-জমা কিনে গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়।
নীরব প্রশাসন ও দায়সারা পর্যবেক্ষণ:
শিক্ষক হাজিরা কিংবা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি বহির কোনো বালাই নেই এই প্রতিষ্ঠানে। এতসব অনিয়ম ও দুর্নীতির পরও রহস্যজনকভাবে নীরব পটুয়াখালী জেলা শিক্ষা অফিস।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ড সরাসরি জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের অধীনস্থ নয়—এমন সুযোগ নিয়ে প্রশাসন যেন ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ নীতিতে চলছে। শিক্ষা অফিসারের দায়িত্বশীল আচরণ যেখানে কঠোর হওয়ার কথা, সেখানে প্রধান শিক্ষকদের অপকর্মের বিরুদ্ধে কেবলই যেন এক মৃদু অনুনয়-বিনয় দেখা যায়।
অন্ধকারের ফাঁদে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ:
ইঁদুর মারার ফাঁদের মতো যুগ যুগ ধরে শিক্ষা ও স্বপ্নের ফাঁদ পেতে বসে আছেন মইনুদ্দীনের মতো দুর্নীতিগ্রস্তরা। যেখানে কৃষকের ফসল রক্ষা পায় না, তেমনি এই প্রতিষ্ঠানের ফাঁদে পড়ে বছরের পর বছর নষ্ট হচ্ছে শত শত শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন ও প্রকৃত কোনো আদর্শ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা না করতে পারায়, মেধাবী হবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
দীর্ঘ ২০ বছর ধরে আলোহীন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি কবে নাগাদ আলোর মুখ দেখবে, কিংবা কবে প্রশাসনিক কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ রক্ষা পাবে—এখন সেটিই পটুয়াখালীবাসীর প্রধান প্রশ্ন।
মন্তব্য করুন