
-মাহ্ফুজ নবীন
বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচার বিভাগ ও সামগ্রিক আইনি ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের মামলাজট, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি ও বিচার বিলম্বের কারণে সাধারণ মানুষ আইনের শাসনের ওপর ভরসা হারাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে কাঠামোগত আইনি সংস্কার অত্যন্ত জরুরি।
সম্প্রতি বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, পুলিশ ও বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থার হার তুলনামূলকভাবে কম। মামলার দীর্ঘসূত্রতা, অপরাধীদের দায়মুক্তি ও প্রভাবশালীদের বিশেষ সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ এই আস্থাহীনতার মূল কারণ বলে মনে করা হয়। আইনজীবী ও বিশ্লেষক মনজিল মোরশেদের মতে, “আইনের চেয়ে প্রভাবশালীদের কথা বেশি চলে, যা সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট করে।”
কেন আইন পরিবর্তন জরুরি?
বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনসহ বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে যে, বর্তমান আইনি কাঠামোয় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগ রয়েছে। প্রধান প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর মধ্যে রয়েছে:
– বিচার বিভাগের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, যাতে আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ কমে।
– বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছ কমিশন গঠন এবং যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে নির্বাচন।
– মামলাজট কমাতে প্রক্রিয়াগত সরলীকরণ, ডিজিটালাইজেশন ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) বাড়ানো।
– দুর্নীতি প্রতিরোধে বিচারক ও কর্মকর্তাদের সম্পত্তির বিবরণ প্রকাশ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
– পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সংস্কার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, আইনের কাঠামোতেই পরিবর্তন আনতে হবে। না হলে অপরাধীদের দায়মুক্তি ও সাধারণ মানুষের বিচার না পাওয়ার সংস্কৃতি চলতে থাকবে।
সরকারের উদ্যোগ ও চ্যালেঞ্জ:
বর্তমান সরকার বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়নের কথা বলছে। কিছু অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তরিত হয়েছে, তবে মূল সংস্কারগুলো (যেমন বিচারক নিয়োগ আইন, স্বতন্ত্র সচিবালয়) এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। অনেকে মনে করেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কায়েমি স্বার্থের কারণে সংস্কার প্রক্রিয়া ধীরগতির।
অপরদিকে কেউ কেউ বলছেন, আইন পরিবর্তনের পাশাপাশি জনসচেতনতা, শিক্ষা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর পেশাদারিত্ব বাড়ানো সমান জরুরি। শুধু আইন বদলালেই চলবে না, তার সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
জনমত:
সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপের দাবি উঠছে। বিশেষ করে দুর্নীতি, ভূমি ও পারিবারিক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং পুলিশের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা হলে জনগণের আস্থা ফিরতে পারে বলে মনে করেন অনেকে।
বিশেষজ্ঞ ও জনমত উভয়ই মনে করে, আইনের প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধারে কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য। তবে সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গতি, স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। এটি শুধু আইনি বিষয় নয়, বরং গণতন্ত্র ও সুশাসনের মৌলিক প্রশ্ন। আরও সংস্কারের অগ্রগতি হলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে।
মন্তব্য করুন