
মাহ্ফুজ নবীন:
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (এফডিসি) একসময় ঢালিউডের প্রাণকেন্দ্র ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলা চলচ্চিত্রের বহু প্রবীণ ও নন্দিত তারকা জীবদ্দশায় ক্ষোভ বা আক্ষেপ প্রকাশ করে বলে গেছেন—“মৃত্যুর পর যেন আমার মরদেহ এফডিসিতে নেওয়া না হয়”।
যে ভালোবাসার কর্মস্থল একজন শিল্পীকে তারকা বানায়, সেই স্থানকে শেষ বিদায়ের জন্য বর্জন করার এই প্রবণতা যেমন ঢালিউডের অভ্যন্তরীণ সামাজিক অবক্ষয়কে স্পষ্ট করে, তেমনই এর পেছনে রয়েছে গভীর ধর্মীয় অনুশাসন ও মৃত্যুর পর আত্মসম্মান রক্ষার সচেতনতা।
নিচে ধর্মীয় অনুশাসন ও সামাজিক বাস্তবতার নিরিখে কারণগুলো বিশ্লেষণ করা হলো:
১. দাফনে দ্রুততা সংক্রান্ত ধর্মীয় নির্দেশ
ইসলামী অনুশাসনসহ প্রায় সকল প্রধান ধর্মেই মৃত্যুর পর মরদেহের সৎকার বা দাফনকার্য যথাসম্ভব দ্রুত সম্পন্ন করার ওপর কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন—“তোমরা জানাজা দ্রুত সম্পন্ন করো।”
এফডিসিতে কোনো তারকার মরদেহ নেওয়া হলে সেখানে মাইক বাজানো, রাজনৈতিক বক্তৃতা, ফুল দেওয়া, অগণিত মানুষের ক্যামেরা-মোবাইল নিয়ে হুড়োহুড়ি ও ছবি তোলার সংস্কৃতি তৈরি হয়। এতে জানাজা ও দাফনের কাজে চরম বিলম্ব ঘটে, যা ধর্মীয় বিধান ও সুন্নাহর পরিপন্থী। অনেক প্রবীণ তারকা শেষ জীবনে এই অনুশাসন মেনে অহেতুক দেরি না করে দ্রুত দাফনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
২. লোকদেখানো আমল ও মরদেহের অহেতুক প্রদর্শনী
ধর্মে লোকদেখানো বা প্রদর্শনপ্রিয়তা (রিয়া) কঠোরভাবে বর্জন করতে বলা হয়েছে। মৃত্যুর পর এফডিসিতে মরদেহ এনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা, ছবি তোলার প্রতিযোগিতা ও শো- অফের মতো যে ‘মেকি শ্রদ্ধাঞ্জলি’র পরিবেশ তৈরি হয়, তা অনেক তারকা মৃত্যুর মুখামুখি হয়ে উপলব্ধি করতে পারেন। একজন মুমিন হিসেবে মৃত্যুর পর নীরবতা, ক্ষমা প্রার্থনা ও মাগফিরাতই আসল পাওনা; কোনো কৃত্রিম ভিড় বা প্রদর্শনীর প্রদর্শনী নয়।
৩. সম্মান ও পেশাদারিত্বের চরম অবক্ষয়
আগের দিনে এফডিসিতে জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের প্রতি যে সম্মান বজায় রাখা হতো, বর্তমানে তার চরম অভাব দেখা যাচ্ছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জায়গায় দখল নিয়েছে নোংরা রাজনীতি, দলাদলি ও সুযোগসন্ধানী আচরণ। ইসলামে প্রবীণদের সম্মান করা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে ঈমানের অংশ বলা হয়েছে। নিজের দীর্ঘ সাধনার স্থানে ধর্মীয় ও নৈতিক সম্মানের এই চরম অভাব দেখে অভিমান থেকে তারা এফডিসি বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন।
৪. নোংরা রাজনীতি ও কাদা ছোড়াছুড়ি
বিগত কয়েক বছরে এফডিসিকেন্দ্রীক নানা সমিতি ও সংগঠনগুলোর নির্বাচনে শিল্পের চেয়ে নোংরা রাজনীতির চর্চা বেশি দেখা গেছে। অপপ্রচার, মামলা-হামলা এবং জ্যেষ্ঠদের অসম্মান করার এই বিষাক্ত পরিবেশ থেকে প্রবীণ শিল্পীরা নিজেদের দূরে রাখতে চান। মৃত্যুর পর পবিত্র শেষ যাত্রার সময় এমন একটি কোলাহলপূর্ণ ও কলুষিত পরিবেশে নিজেদের মরদেহ নিতে দিতে তাদের মন সায় দেয় না।
৫. জীবিত অবস্থায় অবহেলা, মৃত্যুর পর মেকি কান্না
ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষের জীবিত থাকা অবস্থায় তার পাশে দাঁড়ানো ও খোঁজ নেওয়া সবচেয়ে বড় ইবাদত ও দায়িত্ব। কিন্তু অনেক শিল্পীই দেখেছেন, তারা যখন অসুস্থতায় বা আর্থিক কষ্টে দিন কাটান, তখন এফডিসি বা কোনো সংগঠন পাশে থাকে না। অথচ মৃত্যুর পর মরদেহ নিয়ে গিয়ে শোক সভা বা আনুষ্ঠানিকতার নাম দিয়ে সহানুভূতি কুড়ানোর চেষ্টা করা হয়। এই ভণ্ডামি ও দ্বিমুখী আচরণ ধর্মের মূল চেতনার পরিপন্থী বলেই শিল্পীরা তা প্রত্যাখান করেন।
৩. শেষ ইচ্ছে ও পরকালের প্রস্তুতি
জীবনের শেষভাগে এসে মানুষ পরকালের চিন্তায় বেশি মনোযোগী হয়। পৃথিবীর গ্ল্যামার, ক্যামেরা আর করতালি যে ক্ষণস্থায়ী, এই আত্মোপলব্ধি যখন কোনো শিল্পীর মনে জাগে, তখন তিনি চান তার শেষ যাত্রাটি যেন পুরোপুরি ধর্মীয় নিয়ম-কানুন ও নীরব প্রার্থনার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়।
একজন শিল্পীর “এফডিসিতে লাশ না নেওয়ার” শেষ অসিয়ত বা ইচ্ছে শুধু একটি সামাজিক আক্ষেপ নয়, বরং তা ধর্মীয় সচেতনতা, বা হতে পারে এক নীরব প্রতিবাদ। এটি এফডিসিকে আয়না ধরে দেখিয়ে দেয় যে, ধর্মীয় অনুশাসন বজায় রাখা, মরদেহের মর্যাদা দেওয়া এবং জীবদ্দশায় মানুষকে ভালোবাসার সংস্কৃতি থেকে তারা কতটা দূরে সরে গেছে।
মন্তব্য করুন