
পটুয়াখালী প্রতিনিধি:
পটুয়াখালীর সদর উপজেলার ৬ নং জৈনকাঠী ইউনিয়নের সেহাকাঠী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১০ম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ইউনিফর্ম (ড্রেস) না পরার অজুহাতে অমানবিক ও নৃশংস শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে শিক্ষক জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীর পরিবার আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মোঃ রিফাত (রোল নং-১৬) স্কুল ড্রেস সঠিকভাবে পরিধান না করায় শিক্ষক জহিরুল ইসলাম তাকে বেধড়ক মারধর করেন। শিক্ষার্থীর পরিবার জানায়, নির্যাতনের কারণে রিফাত শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে এবং তার লেখাপড়ায় ব্যাঘাত ঘটছে।
শিক্ষার্থীর দাদা “মোঃ গোলাম মস্তফা হাওলাদার ও মাতা নুরজাহান বেগম” ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করে বলেন, “এমন অমানবিক আচরণ যেন আর কোনো শিক্ষার্থীর সাথে না হয়। আমরা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
শিক্ষকের স্বীকারোক্তি:
অভিযুক্ত শিক্ষক “জহিরুল ইসলাম” মুঠোফোনে সাংবাদিকদের বলেন, “এসেম্বলিতে ড্রেস ব্যাগের মধ্যে রেখেছিল, তাই আমি টর্চার করেছি।” এই স্বীকারোক্তি নিজেই ঘটনার গুরুত্ব প্রমাণ করে।
জেলা শিক্ষা অফিসারের বক্তব্য:
পটুয়াখালী জেলা শিক্ষা অফিসার “মুহাঃ মুজিবুর রহমান” বলেন, “এভাবে একজন শিক্ষার্থীকে পেটানো সম্পূর্ণ অমানবিক এবং অন্যায়। আমি ঘটনা ক্ষতিয়ে দেখবো। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তির বিরুদ্ধে ২০১২ সালের আইন/নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
আইনগত দিক: কোন কোন ধারায় অপরাধ?
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন “সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ”। এ ঘটনায় শিক্ষক জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে নিম্নলিখিত আইন ও ধারায় অপরাধ হয়েছে বলে আইনজ্ঞরা মনে করেন:
1. শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা ২০১১ (“শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিতকরণ সংক্রান্ত নীতিমালা”):
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সকল ধরনের শারীরিক (বেত্রাঘাত, চড়-থাপ্পড়, চিমটি, চুল টানা ইত্যাদি) ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ। এটি সরকারি-বেসরকারি সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রযোজ্য। লঙ্ঘন করলে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও ফৌজদারি মামলা।
2. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রায় (২০১১):
Writ Petition No. 5684/2010-এ হাইকোর্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্পোরাল পানিশমেন্টকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। এটি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭, ৩১, ৩২ ও ৩৫(৫) লঙ্ঘন।
3. শিশু আইন ২০১৩, ধারা ৭০:
শিশুর হেফাজতে/দায়িত্বে থাকা অবস্থায় আঘাত, উৎপীড়ন বা নিষ্ঠুর আচরণ করলে অপরাধ। দণ্ড: অনধিক “৫ বছর কারাদণ্ড” অথবা “১ লক্ষ টাকা জরিমানা” অথবা উভয় দণ্ড।
4. “দণ্ডবিধি ১৮৬০”:
- “ধারা ৩২৩”: স্বেচ্ছায় আঘাত করা — অনধিক ১ বছর কারাদণ্ড বা জরিমানা বা উভয়।
– “ধারা ৩২৪”: বিপজ্জনক অস্ত্র বা উপায়ে আঘাত — অনধিক ৩ বছর কারাদণ্ড।
- “ধারা ৩২৫”: গুরুতর আঘাত — অনধিক ৭ বছর কারাদণ্ড ও জরিমানা। এছাড়া “নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন” (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) এবং শিক্ষকের চাকরিবিধি অনুযায়ী বিভাগীয় শাস্তির বিধান রয়েছে।
পরিবারের দাবি:
পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে:
- অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক এজাহার গ্রহণ ও মামলা।
- নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচার।
- শিক্ষার্থীর শারীরিক-মানসিক চিকিৎসা ও নিরাপত্তা।
- বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলার জন্য ব্যবস্থা।
এ ধরনের ঘটনা শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য লজ্জাজনক। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কাম্য।
আপনার মতামত জানান: এমন ঘটনায় কী ধরনের শাস্তি হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
মন্তব্য করুন