
মাহ্ফুজ নবীন
পটুয়াখালী সদর উপজেলার মৌকরণ ব্রিজের নিচে খালের দক্ষিণ পাশের অংশে তীব্র স্রোতের কারণে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এই ভাঙন থেকে খালের পাড় ও সড়ক রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, এটি কোনো প্রকৃত উন্নয়ন প্রকল্প নয়—বরং স্বল্প সময়ের জন্য ‘লোক দেখানো’ কাজ করে রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাটের একটি উদাহরণ।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, খালের দৃশ্যমান অংশে মানহীন পাটের বস্তায় (জুট ব্যাগ) বালু ভর্তি করে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এই বস্তাগুলো তীব্র স্রোত ও জোয়ারের পানিতে স্থায়ীভাবে টিকবে না বলে স্থানীয়রা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “এগুলো শুধু দেখানোর জন্য। পানি এলে ভেসে যাবে বা ছিঁড়ে যাবে। টাকা খরচ হয়েছে কোটি কোটি, কিন্তু কাজের মান নেই।”
পাউবো প্রকৌশলীর বক্তব্য:
পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন প্রকৌশলী এ বিষয়ে জানান, প্রকল্পের বাজেট ও পরিকল্পনা অনুযায়ীই কাজ হয়েছে। তিনি দাবি করেন, খালের ভিতরের (অদৃশ্য) অংশে জিও ব্যাগে (geo-bag) বালু ভর্তি করে অনেকগুলো বস্তা ফেলা হয়েছে। তবে সঠিক সংখ্যা বা বিস্তারিত হিসাব দিতে পারেননি। তিনি শুধু আনুমানিক বলেছেন যে, প্রকল্পের বাজেট কোটি টাকার উপরে। পাটের বস্তার সংখ্যাও স্পষ্ট করতে পারেননি।
এ ধরনের অস্পষ্টতা স্থানীয়দের মধ্যে সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন—দৃশ্যমান অংশে নিম্নমানের পাটের বস্তা ব্যবহার করা হলো কেন? জিও ব্যাগগুলো আদৌ সঠিক স্থানে ও পরিমাণে ব্যবহার হয়েছে কি না, তার কোনো স্বচ্ছ প্রমাণ বা ছবি/ভিডিও প্রকাশ করা হয়নি।
পটুয়াখালীতে ভাঙন ও সুরক্ষা প্রকল্পের প্রেক্ষাপট:
পটুয়াখালী উপকূলীয় জেলা। রাবনাবাদ নদীসহ বিভিন্ন খাল-নদীতে ভাঙন একটি নিয়মিত সমস্যা। পাউবো বিভিন্ন সময় জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ব্যবহার করে সুরক্ষা কাজ করে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে যে, অনেক প্রকল্পে অস্থায়ী ব্যবস্থা নিয়ে কাজ শেষ করা হয় এবং কয়েক মাসের মধ্যেই তা ভেঙে যায়। ফলে বারবার টাকা খরচ হয়, কিন্তু স্থায়ী সমাধান হয় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাটের বস্তা স্বল্পমেয়াদি জরুরি কাজে ব্যবহার করা যায়, কিন্তু তীব্র স্রোতের এলাকায় এটি টেকসই নয়। স্থায়ী সমাধানের জন্য কংক্রিট ব্লক, জিও টেক্সটাইল ম্যাট্রেস বা বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিং (ভেটিভার ঘাস ইত্যাদি) ব্যবহার করা উচিত। কিন্তু বাজেটের বড় অংশ যদি নিম্নমানের উপকরণে খরচ হয়, তাহলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হয় না।
প্রশ্ন উঠছে: উন্নয়ন নাকি ‘হরিলুট’ প্রকল্প?
স্থানীয়রা এ প্রকল্পকে ‘রাষ্ট্রের টাকা ঠিকাদারকে উৎসাহিত করার হরিলুট প্রকল্প’ বলে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে:
- নিম্নমানের পাটের বস্তা ব্যবহার করে খরচ কমিয়ে দেখানো হয়েছে।
- অদৃশ্য অংশের কাজের হিসাব স্বচ্ছ নয়।
- প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্টদের লাভবান করা হয়েছে।
পটুয়াখালীতে এমন অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময় সেতু নির্মাণ, খাল খনন ও ভাঙন রোধ প্রকল্পে অনিয়ম, নিম্নমানের কাজ ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এতে জনগণের ট্যাক্সের টাকা অপচয় হচ্ছে এবং প্রকৃত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব:
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উচিত এ প্রকল্পের বিস্তারিত হিসাব, ব্যয় বিবরণী, বস্তার সংখ্যা ও ব্যবহৃত উপকরণের মান নিয়ে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা। স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর উচিত বিষয়টি তদন্ত করে দেখা যে, প্রকল্পটি সত্যিই জনগণের স্বার্থে বাস্তবায়িত হয়েছে কি না।
যদি এমন প্রকল্পগুলো চলতেই থাকে, তাহলে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেও উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই উন্নয়ন অসম্ভব বলে মনে করছেন সচেতন মহল। প্রকৃত উন্নয়ন চাইলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও টেকসই প্রযুক্তি নিশ্চিত করতে হবে—শুধু ‘লোক দেখানো’ প্রকল্প নয়।
(এই প্রতিবেদন স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে তৈরি। আরও তথ্য পেলে আপডেট করা হবে।)
মন্তব্য করুন