
গলাচিপা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি:
পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলার বাঁশবাড়িয়া কারিগরি ভোকেশনাল উচ্চ বিদ্যালয়ে ভয়াবহ অনিয়ম, দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগ বাণিজ্য এবং প্রধান শিক্ষকের চরম স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে। ২০০০ সালের পর, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে পড়াশোনার ন্যূয়নতম পরিবেশ নেই বলে স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ। প্রতিষ্ঠান প্রধানের দায়িত্বহীনতায় চরম হুমকির মুখে পড়েছে শত শত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ।
পোশাক ও পেশাগত মর্যাদার চরম অবমূল্যায়ন:
একজন প্রতিষ্ঠানের মূল কান্ডারী হলেও প্রধান শিক্ষক মইনুদ্দীন আহমদের বিরুদ্ধে পেশাগত পোশাক ও আচরণের নানাবিধ গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তিনি প্রায়শই নোংরা ও দাগযুক্ত পোশাক পরিধান করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসা-যাওয়া করেন। এমনকি এই পোশাকেই তিনি জেলা শিক্ষা অফিসারের সাথে বিভিন্ন সভায় অংশগ্রহণ করেন বলে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি নেই; নিজের ইচ্ছামত স্কুলে আসা এবং যখন-তখন ছুটি ঘোষণা করা তার নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
শিক্ষক নিয়োগ বাণিজ্য ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ:
প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের নামে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য করার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। একাধিক গোপন সূত্রের তথ্যমতে, নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া অর্থ দিয়ে প্রধান শিক্ষক নিজস্ব পাকা বাড়ি ও জমিজমা ক্রয় করেছেন। উক্ত বিদ্যালয়ের এক নারী শিক্ষকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেন যে, “চাকরি পেতে হলে দুই-চার লাখ টাকা তো দিতেই হয়।” যদিও পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষকের ইশারায় তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করলেও বিদ্যালয়ের কাঠামোগত কোনো উন্নয়ন করা হয়নি। বর্তমানে জীর্ণশীর্ণ ও আধুনিকতাহীন কাঠামোর কারণে পুরো বিদ্যালয়টি একটি জরাজীর্ণ ও ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
ভৌত অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের চরম অভাব:
একটি ভোকেশনাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য যে ধরনের অবকাঠামো প্রয়োজন, তার কিছুই নেই বাঁশবাড়িয়া কারিগরি ভোকেশনাল উচ্চ বিদ্যালয়ে। প্রতিষ্ঠানে নেই কোনো আধুনিক পাকা ভবন, নেই পর্যাপ্ত মানসম্মত শিক্ষক। এমনকি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবহারের জন্য কোনো বাথরুমের সুব্যবস্থাও নেই।
পড়াশোনার বেহাল দশা ও অসৌজন্যমূলক বক্তব্য:
প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও শৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। দুপুর ১২টা বাজতেই পুরো স্কুল ফাঁকা হয়ে যায় এবং তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। শিক্ষার পরিবেশ না থাকায় এবং ক্লাস না হওয়ার সুযোগে বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনা ছেড়ে অপ্রাসঙ্গিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষককে প্রশ্ন করা হলে তিনি দায় এড়িয়ে গিয়ে বলেন, “কোন স্কুলে প্রেম চলে না?”
প্রতিবেশী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও ঈর্ষা:
বাঁশবাড়িয়া কারিগরি বিদ্যালয়ের কয়েকশত গজ দূরে অবস্থিত অপর একটি কারিগরি কলেজের সুনাম ও উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে প্রধান শিক্ষক মইনুদ্দীন অপপ্রচার চালাচ্ছেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। পাশের কারিগরি বিদ্যালয়ের শিক্ষকের বিরুদ্ধে তিনি অনৈতিক আচরণের মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ তোলেন। বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, স্বনামধন্য সেই প্রতিবেশী প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে এবং নিজের প্রতিষ্ঠানের চরম ব্যর্থতা ঢাকতেই তিনি কাল্পনিক গল্প সাজিয়েছেন।
সাংবাদিকদের ওপর ক্ষোভ ও সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার:
উক্ত বিদ্যালয় ও প্রধান শিক্ষকের নানাবিধ দুর্নীতির বিষয়ে সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও তথ্য জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক মইনুদ্দীন সাংবাদিকদের ওপর চরম ক্ষিপ্ত হন। তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের ‘হলুদ সাংবাদিক’ ও ‘ভূয়া সাংবাদিক’ বলে আখ্যা দেন এবং অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করেন। পরবর্তীতে নিজের অপকর্ম ঢাকতে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সাংবাদিক ও পার্শ্ববর্তী প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মানহানিকর বক্তব্য পোস্ট করেন।
স্থানীয় অভিভাবকদের মতে, তথাকথিত সুযোগ-সুবিধার আশ্বাস দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করানো হলেও বাস্তবে কোনো লেখাপড়া হয় না। ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জীবন ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া এই নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানটি আর চালু রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি:
সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, প্রধান শিক্ষকের এসব বক্তব্য, অশালীন আচরণ ও নিয়োগ বাণিজ্যের স্বীকারোক্তি মূলক বক্তব্য ভিডিও প্রমাণে সংরক্ষিত রয়েছে। শিক্ষা বিভাগের ঊর্ধ্বতন মহলের পক্ষ থেকে তদন্ত সাপেক্ষে এই দুর্নীতিগ্রস্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ও সুশীল সমাজ।
মন্তব্য করুন