
মাহ্ফুজ নবীন:
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসরদের দ্বারা ব্যাপক ধর্ষণের ঘটনা ইতিহাসের অন্যতম বড় যৌন সহিংসতার উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত। অন্যদিকে, স্বাধীনতার পর থেকে বিশেষ করে সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরত বাংলাদেশি নারীদের ওপর যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগ বারবার উঠে আসছে। দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটের তুলনা করলে কিছু উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষিত নারীর সংখ্যা
বাংলাদেশ সরকারের অফিসিয়াল অনুমান অনুসারে, যুদ্ধকালীন ৯ মাসে প্রায় ২ লাখ নারী ধর্ষিত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক ও গবেষণামূলক সূত্রগুলোতে এই সংখ্যা ২ লাখ থেকে ৪ লাখ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়।
– অস্ট্রেলিয়ান চিকিৎসক ডা. জিওফ্রে ডেভিসের অনুমান: ৪ লাখ।
– উপসালা ইউনিভার্সিটির গবেষণা ও অন্যান্য সূত্র: ২-৪ লাখ।
– যুদ্ধের পর ১.৭ লাখের মতো গর্ভপাত এবং হাজার হাজার “যুদ্ধশিশু” জন্ম নেয়ার ঘটনা এই সংখ্যার সাক্ষ্য দেয়।
এই ধর্ষণকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন।
সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারীদের ওপর যৌন নির্যাতন
স্বাধীনতার পর থেকে (বিশেষ করে ১৯৯১ সালের পর) লক্ষাধিক বাংলাদেশি নারী সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে গিয়েছেন। সুনির্দিষ্ট কোনো সম্পূর্ণ জাতীয় পরিসংখ্যান নেই, কারণ অনেকে ভয়ে অভিযোগ করেন না। তবে বিভিন্ন এনজিও ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুসারে:
– ১৯৯১-২০২১ সাল পর্যন্ত প্রায় ৯ লাখের বেশি বাংলাদেশি নারী মধ্যপ্রাচ্যে (বিশেষ করে সৌদি আরবে) গিয়েছেন।
– BRAC-এর তথ্য অনুসারে, বিগত কয়েক বছরে হাজার হাজার নারী নির্যাতিত অবস্থায় ফিরেছেন। শত শত ক্ষেত্রে ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন ও গর্ভবতী হয়ে ফেরার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
– ২০১৮ সালের আশেপাশে কয়েক মাসে শতাধিক নারী অভিযোগ করেছেন। প্রতি মাসে গড়ে ২০০ জনের মতো নারী নির্যাতিত অবস্থায় ফিরছেন বলে কিছু প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
– গত ৫-৭ বছরে সৌদি আরব থেকে ফেরা নারীদের মধ্যে শতাধিক ধর্ষণ ও গর্ভধারণের ঘটনা BRACসহ অন্যান্য সংস্থার কাছে নথিভুক্ত।
বাস্তবতা: যুদ্ধকালীন ৯ মাসে লক্ষাধিক নারীর ওপর সংঘটিত ধর্ষণের সাথে সৌদি আরবে দীর্ঘ সময় ধরে চলা ব্যক্তিগত নির্যাতনের সরাসরি তুলনা করা কঠিন। তবে দুটি ক্ষেত্রেই নারীরা চরম সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য:
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, “১৯৭১ সালের ধর্ষণ ছিল রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ, আর সৌদি আরবে এটি কাফালা ব্যবস্থা ও অরক্ষিত অভিবাসন নীতির ফল। উভয় ক্ষেত্রেই নারীদের মর্যাদা লঙ্ঘিত হয়েছে।”
সরকারি তথ্য অনুসারে, অভিবাসী নারীদের সুরক্ষায় প্রশিক্ষণ ও কূটনৈতিক চাপ বাড়ানো হচ্ছে। তবে অনেকে মনে করেন, আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও বিকল্প কর্মসংস্থানের প্রয়োজন।
(উৎস: বাংলাদেশ সরকারি দলিল, Liberation War Museum, BRAC Migration Programme, The Daily Star, Al Jazeera, Amnesty International এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদন।)
মন্তব্য করুন