
পঞ্চগড় প্রতিনিধি:
পঞ্চগড়ের মর্মান্তিক এক ঘটনায় নিজের ছোট ভাইকে হত্যার অভিযোগে বড় বোন সমলা আক্তার ও তার চাচাতো ভাই সাহাবুদ্দিন গ্রেপ্তার হয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে যৌন নির্যাতন ও ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়ে আসা সমলা আক্তার প্রতিশোধ নিতে এই হত্যার পরিকল্পনা করেন এবং প্রতিবেশীদের ফাঁসানোর চেষ্টা করেন।
ঘটনার পটভূমি
সমলা আক্তার জানান, প্রায় তিন মাস আগে তার ছোট ভাই মানিক জোরপূর্বক তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে এবং গোপনে ভিডিও ধারণ করে। এরপর থেকে সেই ভিডিও স্বামীর কাছে দেখিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তাকে নিয়মিত ব্ল্যাকমেইল করত এবং বারবার শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করত।
এই অমানবিক নির্যাতন সমলা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। দীর্ঘদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে সহ্য করার পর অবশেষে তিনি স্বামীকে পুরো ঘটনা খুলে বলেন।
হত্যার পরিকল্পনা
গত ১২ জুলাই প্রতিবেশীদের সঙ্গে পরিবারের বিরোধের ঘটনা ঘটলে সমলা আক্তার এই সুযোগকে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ভাই মানিকের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিবেশীদের ফাঁসানোর পরিকল্পনা করেন। এতে তার চাচাতো ভাই সাহাবুদ্দিন সহযোগিতা করেন।
ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা
১৩ জুলাই সন্ধ্যা: সমলা আক্তার কৌশলে মানিককে পঞ্চগড় সদর থানার ভিতরগড় মৌজার মহারাজার দীঘি এলাকায় নিয়ে যান। সেখানে একটি বাড়িতে মানিক আবারও তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে। পরে তারা দীঘির পাশের একটি হোটেলে যান।
হোটেলে বসে সমলা আক্তার কৌশলে মানিকের খাবারের পানিতে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেন। কিছুক্ষণ পর রাত সাড়ে ১০টার দিকে মানিকের ঘুম ঘুম ভাব দেখা দিলে তাকে নিয়ে দীঘির পশ্চিম পাড়ে নিয়ে যান।
সেখানে মানিক টলতে থাকলে সমলা তার পকেট থেকে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোনটি বের করে দীঘির পানিতে ফেলে দেন। এরপর আগে থেকে লিখে আনা চিরকুট (যাতে প্রতিবেশীদের দায়ী করা হয়েছিল) পলিথিনে মুড়িয়ে মানিকের কোমরে গুঁজে দেন। তারপর তিনি রাস্তার পাশে অপেক্ষা করতে থাকেন।
কিছুক্ষণ পর সহযোগী সাহাবুদ্দিন এসে মানিককে হত্যা করে তার মরদেহ দীঘির পানিতে ফেলে দেন। রাত প্রায় ১টার দিকে সমলা আক্তার ও সাহাবুদ্দিন নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যান।
উদ্ধার ও তদন্ত
১৫ জুলাই: মহারাজার দীঘি থেকে মানিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের কোমরে পাওয়া চিরকুটে প্রতিবেশীদের হত্যার জন্য দায়ী করা হয়েছিল।
তদন্তে পুলিশ সমলা আক্তারের ঘর থেকে উদ্ধার করা একটি ক্যালেন্ডারের লেখার সঙ্গে চিরকুটের হস্তাক্ষর হুবহু মিলে যায়। জিজ্ঞাসাবাদে সমলা আক্তার হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। পুলিশ চিরকুটের সঙ্গে মিলে যাওয়া লেখা ও মানিকের বাটন ফোনও উদ্ধার করে।
১৬ জুলাই: পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফরহাদ হোসেন সংবাদ সম্মেলনে জানান, সমলা আক্তার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের বিষয় স্বীকার করেছেন।
এ ঘটনায় নিহত মানিকের বড় বোন সমলা আক্তার ও সাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এই ঘটনা পঞ্চগড়সহ আশপাশের এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
মন্তব্য করুন