
মাহ্ফুজ নবীন:
কোনো ব্যক্তি ঘুষ নিচ্ছেন, সরকারি কর্মকর্তা অনিয়ম করছেন, অথবা কোনো অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে— এমন পরিস্থিতিতে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করা যাবে কি? সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক কি না? এ প্রশ্নের উত্তর বাংলাদেশে সরাসরি কোনো একক আইনে নেই; তবে সংবিধান, সাক্ষ্য আইন এবং গোপনীয়তার নীতির সমন্বিত ব্যাখ্যা থেকে একটি আইনি কাঠামো পাওয়া যায়। (VDB | LOI)
গোপনীয়তার অধিকার কী বলে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদে নাগরিকের ব্যক্তিগত জীবন, বাসগৃহ ও যোগাযোগের গোপনীয়তার অধিকার স্বীকৃত। ফলে কোনো ব্যক্তি এমন স্থানে অবস্থান করলে যেখানে তিনি স্বাভাবিকভাবেই ব্যক্তিগত গোপনীয়তা প্রত্যাশা করেন— যেমন বাসা, ব্যক্তিগত কক্ষ বা ব্যক্তিগত বৈঠক— সেখানে গোপনে ভিডিও বা অডিও ধারণ করা আইনি বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে। (Reddit)
প্রকাশ্য স্থানে ভিডিও করা কি বৈধ?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ঘটনা যদি জনসমক্ষে বা প্রকাশ্য স্থানে ঘটে, তাহলে তা ভিডিও করার ক্ষেত্রে গোপনীয়তার দাবি তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়। উদাহরণস্বরূপ, রাস্তায় সংঘটিত অপরাধ, প্রকাশ্যে ঘুষ লেনদেন, বা জনসমক্ষে কর্তব্যরত কর্মকর্তার আচরণ ভিডিও করা সাধারণত ব্যক্তিগত শয়নকক্ষ বা বন্ধ কক্ষের গোপন রেকর্ডিংয়ের মতো বিবেচিত হয় না।
তবে ভিডিও ধারণের বৈধতা থাকলেও সেটি পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ, সম্পাদনা করে বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন, বা মানহানিকর উদ্দেশ্যে ব্যবহার করলে অন্য আইনি দায় তৈরি হতে পারে।
দুর্নীতির প্রমাণ হিসেবে ভিডিও কি আদালতে গ্রহণযোগ্য?
বাংলাদেশে ২০২২ সালে সাক্ষ্য আইন সংশোধনের মাধ্যমে ডিজিটাল প্রমাণকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণযোগ্য করা হয়েছে। সংশোধিত আইনে অডিও, ভিডিও, মোবাইল ফোনের রেকর্ড, CCTV ফুটেজ, ড্রোন ডেটা এবং অন্যান্য ডিজিটাল রেকর্ডকে প্রমাণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। (VDB | LOI)
এ কারণে কোনো দুর্নীতি বা অপরাধের ভিডিও আদালতে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে, যদি তার সত্যতা ও উৎস যথাযথভাবে প্রমাণ করা যায়। প্রয়োজনে ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমেও ভিডিও যাচাই করা হতে পারে। (VDB | LOI)
অনুমতি নেওয়া কি বাধ্যতামূলক?
বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে প্রকাশ্য স্থানে দৃশ্যমান কোনো ঘটনা ভিডিও করার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক— এমন স্পষ্ট বিধান নেই। তবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন না করা এবং ভিডিওর অপব্যবহার না করা গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিবেচ্য বিষয়।
অন্যদিকে, ব্যক্তিগত কথোপকথন গোপনে রেকর্ড করা বা ব্যক্তিগত পরিবেশে লুকিয়ে ভিডিও ধারণ করলে তা গোপনীয়তার অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা:
আইনবিদদের মতে, “অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ” এবং “ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন”— এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। কোনো ভিডিও যদি জনস্বার্থে, অপরাধ উদ্ঘাটনের উদ্দেশ্যে এবং সত্যতা বজায় রেখে ধারণ করা হয়, তাহলে তার আইনি গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি হতে পারে। কিন্তু একই ভিডিও অপমান, ব্ল্যাকমেইল বা মানহানির উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলে ফৌজদারি বা দেওয়ানি দায় সৃষ্টি হতে পারে।
প্রকাশ্য স্থানে সংঘটিত দুর্নীতি বা অপরাধ ভিডিও করা সাধারণত ব্যক্তিগত স্থানে গোপন রেকর্ডিংয়ের তুলনায় বেশি আইনসম্মত।
ব্যক্তিগত পরিবেশে গোপনে ভিডিও ধারণ আইনি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণ সব ক্ষেত্রে অপরাধ— এমন কোনো স্পষ্ট বিধান বাংলাদেশে নেই।
২০২২ সালের সাক্ষ্য আইন সংশোধনের পর ডিজিটাল ভিডিও ও মোবাইল রেকর্ড আদালতে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। (VDB | LOI)
ভিডিও ধারণের চেয়ে ভিডিওর পরবর্তী ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে বড় আইনি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
(সংবাদধর্মী বিশ্লেষণ; এটি আইনগত পরামর্শ নয়। নির্দিষ্ট ঘটনার ক্ষেত্রে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।)
মন্তব্য করুন